আমার নীল চাদর || ধ্রুব এষ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৫, ২০২০

আমার নাম সারি।

শারি না, সারি।

শালিক পাখি না, আমি নদী।

তবে আমার মা পাখি। পাখিবিবি। নাজিয়া হক পাখি। আমি ডাকি পাখিবিবি।

আমার একটা নীল চাদর আছে। আমাদের দেশের সব নদীর নাম লেখা আছে এই চাদরে। কত নদী আমাদের দেশে! একটা হলো সারি। আমি এই সারি নদীতে জন্মেছি। মজা করছি না। পাখিবিবির ঘটনা। শখ কত মহিলার, সাড়ে ছয় মাসের আমাকে পেটে নিয়ে তার মামার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। ছোট শালিকপুর। সারি নদীতে কখনো সখনো ছায়া পড়ে ছোট শালিকপুরের। দিনেও পড়ে, রাতেও পড়ে। সেই রাতে পড়তে পারেনি। ঝুম বৃষ্টিতে তল্লাট উথালপাথাল হচ্ছিল। বিপদের উপর বিপদ, কোনো রকম জানান না দিয়ে পেইন উঠেছিল পাখিবিবির। নৌকায় তার মামার গোষ্ঠী তাকে টাউনের মাতৃমঙ্গলে নিয়ে যাচ্ছিল। নদীতেই আমি হয়ে যাই। এজন্য পাখিবিবি আমার নাম রেখেছে সারি। এহ্! আমি যদি আড়িয়াল খাঁ নদীতে জন্মাতাম।

শীতকালে আমি আমার নীল রঙের চাদরটা পরি। বৃষ্টির দিনেও পরি কখনো-সখনো। নদীর নাম মুখস্থ করি। বলি কয়েকটা। মাথাভাংগা, খারখারিয়া, ফকিরশা বরনাই, পাংগানি, ঘাঘট, বসাখালি।

‘ধন্যবাদ, পাখিবিবি। কষ্ট করে তুমি আমাকে সারি নদীতেই জন্ম দিয়েছ।’

‘এ আবার কী রকমের কথা? কেন? সারি নদীতে জন্ম নিয়ে তুমি কোন ভালো মেয়েটা হয়েছ শুনি?’

‘হি! হি! হি! পাখিবিবি তুমি জান, আমি হলাম এই পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মেয়েটা।’

‘কী? পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মেয়েটা? ওরে আমার ময়না পাখি রে! হি হি হি! তুই ভালো একথা কে বলেরে গাছপাকা বদমায়েশ মেয়ে? হি-হি-হি!’

‘তুমিই বলো, পাখিবিবি। বাদ দাও। সারি নদীর কথা বলে কেন তোমাকে ধন্যবাদ দিলাম শোনো। ঘাঘট একটা নদী আছে জানো? মগরা একটা নদী আছে? কাকড়ি একটা নদী আছে জানো? ওইসব নদীতে যদি তুমি বিয়োতে!’

‘কী কথা! বিয়োতে কি রে? কথার কোনো ছিরিছাদ নাই। ভালো হতো তুই ঘাঘট নদীতে জন্মালে। কি মগড়া কি কাকড়ি নদীতে জন্মাতে।’

‘কী হতো, জননী?’

‘তোর নাম হতো ঘাঘট। কি মগড়া কী কাকড়ি।’

‘ইহ্!’

পাখিবিবি স্মার্ট মহিলা। ফাইন আর্টসে পড়েছে। ব্যান্ডসংগীত করে। আমি তাদের কিছু স্টেজ শো দেখেছি। মজার। কিছু অন্যরকম গান করে তারা। তবে আজিবও আছে অনেক। তাদের গান তারা ইউটিউব, ফেসবুক চ্যানেলে আপলোড দেয় না। সোশ্যাল মিডিয়ায় নেই তারা। তাদের দলের নাম- ‘অ-সামাজিক।’ ব্যক্তিগতভাবে ব্যান্ডের মেম্বার ফেসবুক, টুইটারে আছে। কিন্তু ‘অ-সামাজিক’ নিয়ে তারা একটা পোস্টও শেয়ার করে না কখনো।

ফেসবুকে আমাদের একটা গ্রুপ আছে। ডেয়ার ডেভিল গ্রুপ। পাখিবিবি একদিন কমেন্ট করল কী, ডিমের ডেভিল গ্রুপ। সঙ্গে সঙ্গে মহিলাকে আমি আনফ্রেন্ড করে দিলাম। বেয়াদব মহিলা। প্রায় এরকম তাকে আমি আনফ্রেন্ড করি। তাতে সমস্যা কিছু হয় না। আমি আমার পৃথিবীর খুঁটিনাটি, নাট-বল্টু সমেত শেয়ার করি পাখিবিবির সঙ্গে। আর এই পৃথিবীতে আমার একমাত্র সেরা বন্ধু হলো নিক্কু। নিক্কুর এবং আমার জন্মদিন এক। আঠারো জুলাই। সে অবশ্য নদীতে হয়নি, তাদের শহরের একটা নার্সিংহোমে হয়েছে।

‘জ’-কে আগে ‘ঝ’ বলত নিক্কু। সে একেক কাণ্ড!

‘তোর জন্মদিন কবে রে, নিক্কু?’

‘কেন?’

‘আঠারো ঝুলাই।’

‘ঝুলাস মানে?’

‘ঝুলাই না, আঠারো ঝুলাই।’

‘আঠারো ঝুলাস? উনিশ ঝোলা! হি! হি! হি!’

এখন জ-কে জ-ই বলে নিক্কু। ভালো হয়েছে। না হলে জুন্নুনকে বলত ঝুন্নুন। বিশ্রি ব্যাপার হতো। জুন্নুনের সঙ্গে এর মধ্যে আমি তিনবার ডেট করেছি। একবার লং ড্রাইভে গেছি। আজব একটা জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল জুন্নুন। কলাতিয়া। কী যে সবুজ। ঢাকার এত কাছে এমন সবুজ জায়গা আছে ঝানতাম না। হি! হি! হি! মন ভরে গেছে। সন্ধ্যায় আমরা জোনাকি দেখে ফিরেছি। একটা দুটো না, অনেক জোনাকি।

জুন্নুন স্মার্ট, সংবেদনশীল। তার কথা আমি পাখিবিবি এবং অবশ্যই নিক্কুকে বলেছি।

নিক্কুর রিঅ্যাকশন হলো- ‘তুই কি জুন্নুনকে বিয়ে করবি নাকি?’

‘বিয়ে! তুই কি উন্মাদ?’

‘তাহলে এত বাকবাকুম কিসের?’

‘ওহ্ নিক্কু! তুই আগের জন্মে পাখিবিবি ছিলি। এত একরকম কথা বলিস তোরা। সে ঠিক এই কথাটাই বলল। জুন্নুনের সঙ্গে এত বাকবাকুম কিসের।’

‘বলবে না! সে কি আর তোর মতো ঢংগী!’

‘আমি ঢংগী?’

‘ঢংগী না, তুই ঢংগী টু দ্য পাওয়ার ইনফিনিটি। এখন একটা কথা আবার বলি, শোন ঢংগী, আমি কিন্তু এই দ্বিতীয়বারের মতো তোকে সতর্ক করে দিচ্ছি, ম্যাকের সামনে তুই আমাকে আর ভুল করেও নিক্কু ডাকবি না!’

‘ডাকব না, যা। কিন্তু তোর নাম যে নিকিতা, এটা তো আমি ভুলে গেছি।’

‘এই যে বললি!’

‘কী বলেছি?’

‘তুই একটা খারাপের বাক্স।’

হ্যাঁ। ভালোর বাক্স হলো নিক্কু। এইট থেকে ডেইট করে সে। বর্তমান ম্যাক একজন বয়স্ক ব্যক্তি। মাকসুদ নূর। অধ্যাপক গবেষক। নিক্কু তাকে নিয়ে গবেষণা করে। অধ্যাপক গবেষকের বাসায় আমাকে নিয়ে গিয়েছিল একদিন। অত্যন্ত নার্ভাস ছিলেন অধ্যাপক গবেষক।

‘ইন্ট্রোভার্ট লোক তো। মেয়েদের দেখলে নার্ভাস হয়ে যায়।’

নিক্কুর বোকা ওকালতি। আমি অবশ্য বলতে পারতাম, তুই কি মেয়ে না? বলিনি। এ মা! পরে নিক্কুর নার্ভাস হারামজাদাই দেখি রাত তিনটায় টেক্সট মেসেজ পাঠায়- ‘ঘুম ধরে না। তুমি কি ঘুমাও?’

নিক্কু ডিটারমাইন্ড সে বিয়ে করবে ম্যাককে। এল আর বি পুরা। লাভ রানস ব্লাইন্ড। এই নিক্কুকে কিছু বলে কী হবে। সাইজ করে দিয়েছি ম্যাক ব্রো-কে। আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগ করে হতোদ্যম করে দিয়েছি। আমি চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালি, কুষ্টিয়া এবং রাজশাহীর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে পারি। ভালোই পারি। ম্যাক কল দেয় ধরি না ধরি না, একদিন ‘সিলেটি’ হয়ে ধরলাম।

‘অ্যা-লো-উ-ও-ও।’

‘হ্যালো! সারি!’

‘শাড়ি! শাড়ি কিতারে? তুই কেঠা?’

‘হ্যালো এটা কি সারির নাম্বার?’

‘শাড়ির নাম্বার কিতারে? এই আরুল! শাড়ির আবার নাম্বার অয়নিতা? কোন দেশি মাকাল বে তুই?’

‘স্যরি! রং নাম্বার হয়ে গেছে মনে হয়। আমি রাখি।’

‘রং নাম্বার! এই এই এই! রাখিস না কইলাম। মোবাইল ফোনো আবার রং নাম্বার অয়নি রে, হালার হালা। মন দিয় হুন অনে। ইটা তোর বউয়ের শাড়ি ব্লাউজ ফেটিকোট, কুছতার নাম্বার না বুঝছস? আর কুনুদিন কল দিয়া দেখিস, সাইবার আইনে মামলা দিমু তোর নামে। আমার বড় মামা র‌্যাবের কমান্ডার জানস তো? তুই কিতা মনো করছস? তুই কেঠা আমি বুঝেরাম না? মকছুন্নুর না তুই?’

আহারে ম্যাক। নার্ভাস ম্যাক। আর কল করেনি বেচারা। টেক্সটও পাঠায় না। নিক্কুকে কিন্তু বলেনি কিছুই। বললে নিক্কু আমাকে বলত। আমিও নিক্কুকে আর কিছু বলিনি। পাখিবিবিকে পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনি বলেছি। পাখিবিবি হাড়-হাড্ডিতে চেনে ম্যাককে। কাহিনি শুনে বলল, ‘নিকিতাকে কুইট করতে বল।’

‘আমি কেন বলব?’

‘তবে তুই তার কিরকম বন্ধু?’

‘তুমি জানো সে আমার বকুলফুল সই, পাখিবিবি। হি! হি! হি! কিন্তু ম্যাককে কুইট করেই আমার প্রাণপ্রিয় বকুলফুল সই যে জুন্নুনের ঘাড়ে লাফ দিয়ে পড়বে।’

‘পড়ল। তুই তো আর জুন্নুনকে বিয়ে করবি না!’

‘বিয়ে না করলাম। জুন্নুন এখনো আমার বয়ফ্রেন্ড, পাখিবিবি।’

‘বয়ফ্রেন্ড!’

‘অবশ্যই, মাই ফেয়ার লেডি। আচ্ছা, তোমার একটা বয়ফ্রেন্ড কেন হয় না? এই-এই-এই! কী হয়েছে? ব্লাশ করছো কেন তুমি? ধরা পড়ে গেছো পাখিবিবি। কী হয়েছে আমাকে বলো।’

পাখিবিবি আমাকে না বলে পারে? পার পাবে?

বলল। ভয়ংকর ঘটনা। ওক পিপুল প্রপোজ করেছে পাখিবিবিকে। এটা ভয়ংকর ঘটনা না। হামেশা কতজন এরকম ভয়ংকর প্রপোজ করে পাখিবিবিকে। মনেও রাখে না পাখিবিবি।

ঘটনা হলো ওক পিপুলকে পাখিবিবি ইয়েস কার্ড দিয়েছে। তার নাম পিপুল। কিন্তু ওক গাছের মতো দেখতে। এজন্য ওক পিপুল। এই ব্যাটাকে আমি দেখেছি। ছয় ফুট দুই ইঞ্চি লম্বা। ক্যারিবিয়ান পাইরেটদের মতো দেখতে। মানাবে পাখিবিবির সঙ্গে। বাবা-বুবা ডাকতে পারব না, তবে স্টেপ ফাদার হিসেবে আমি মেনে নিতে পারব ব্যাটাকে। আমার মতো ধিঙ্গি একটা মেয়ে আছে পাখিবিবির, এই তো ফ্যাপারে কী মত ব্যাটার? আমি কি তাদের সঙ্গে থাকব? নাকি হোস্টেলে? আমার মনে হলো হোস্টেলই ভালো। নিক্কুর কাজিন এশার সঙ্গেও থাকা যায়। এশারা তিনজন পিংক সিটিতে একটা চাররুমের ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে।

‘লুপি পি কাও।’ আমি বললাম।

পাখিবিবি বলল, ‘কী?’

‘ওক পিপুল।’

ফেসবুকে আমার বন্ধু তিনশ আটজন। রংপুরের হনুমানতলায় থাকে আশ্বিনী। কুয়াশায় ঢাকা হনুমানতলায় একটা ছবি সে পোস্ট দিয়েছে মাত্র। নভেম্বরের সাতাশ তারিখ চলে যাচ্ছে আজ। উত্তরবঙ্গে শীত পড়ে গেছে জাঁকিয়ে। ঢাকায় হঠাৎ হঠাৎ কনকনে ঠান্ডা বাতাস হয়ে যায় শুধু, শীতের আর কোনো আলামত নাই। জুন্নুন মজার কথা বলছে, বাসের টিকিট কেনার টাকা নাই তো, এজন্য শীত পায়ে হেঁটে উত্তরবঙ্গ থেকে রওনা দিয়েছে ঢাকায়। ঘণ্টায় কত মাইল হাঁটা যায় আর? সে আবার শীত, সব সময় কাঁপছে।

উইটি জুন্নুন।

লাইক দিলাম আশ্বিনীর ছবিতে। সামিরাকে ইনবক্সে লিখলাম-‘আমরা কাল সন্ধ্যায় বান্দরবান যাচ্ছি। আমি নিক্কু ফারিহা নীড়, বাবুই। তুই কি যাবি? যেতে চাইলে কাল সন্ধ্যা সাতটায় রাজারবাগ বাসস্ট্যান্ডে থাকবি। কাউকে আবার কিছু বলতে যাবি না। নিক্কু, ফারিহাদেরকেও না। তারা বলবে তারা কিছুই জানে না। সিক্রেট মিশন। তুই আয়। বাসস্ট্যান্ডে আয়।’

সামিরা কী করে দেখা যাক।

তটিনী, রিজু আছে অনলাইনে। চ্যাট করা? না, পরে। ছাদে যাই একটু।

আমি আমার নীল চাদরটা পরলাম।

পাখিবিবি বলল, ‘সারিবাপ! কী হয়েছে?’

‘কী হবে পাখিবিবি। ছাদে যাব।’

‘ছাদে? কেন? সন্ধ্যা হয়ে গেছে।’

‘সন্ধ্যা হলে ছাদে যেতে নেই নাকি? ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে। ছাদে একটু হাঁটব।’

তিনতলায় অনিরা থাকে। চারতলায় থাকে সূর্যরা। আজব! একটা মেয়ের নাম সূর্য। এই সূর্যর ভাইয়ের নাম রশ্মি। কলেজে পড়ে। কার্টুনের মতো দেখতে। ছাদে বসে ফোনে কথা বলছিল। আমাকে দেখে কথা বন্ধ করে দিল, উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্লামালিকুম, সারি আপু।’

চোর চোর গলা।

‘ওয়ালিকুম সালাম। কেমন আছো, রশ্মি?’

‘ভালো আছি, আপু।’

‘গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে কথা বলছিলে নাকি?’

‘আরে না, আপু। ভাই। ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলছিলাম।’

‘অ। কাজিন?’

‘না আপু, ভাই। জাকারিয়া ভাই।’

‘জাকারিয়া ভাই! এটা কে?’

‘আরে আপু, লিডার জাকারিয়া ভাই!’

‘অ-অ-অ। তুমি তার চ্যালা হয়েছো নাকি?’

‘ভাই আমাকে বিরাট স্নেহ করেন, আপু।’

‘বিরাট স্নেহ করে! ভালো তো।’

‘আচ্ছা আপু আমি যাই আপু।’

‘আচ্ছা, যাও। তুমি বড় হয়ে গেছো, রশ্মি’

তাড়াহুড়া করে নেমে গেল রশ্মি। টিন এজার। ভাই চিনে গেছে। ভাই তাকে বিরাট স্নেহ করেন! এই মুহূর্তে রশ্মির এইম ইন লাইফ কী? নিশ্চয় টু বি আ ভাই।

দূরে দূরে সমস্ত নিয়ন সাইন জ্বলছে।

মস্ত ছাদে আমি এখন একা। ছাদে অন্ধকার।

পাখিবিবি তাহলে একটা সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। ভালো করেছে। আর কত?

হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস কাঁটা দিয়ে উঠল।

আকাশের অনেক উঁচু দিয়ে কি একটা স্যাটেলাইট উড়ে যাচ্ছে? মনে হচ্ছে পার্পল একটা জোনাকি।

নাম্বারটা আমার ফোন বুকে আছে। নাম্বারটা আমার মুখস্থ। চোখ বন্ধ করে টাইপ করতে পারি। এখনো করলাম এবং কল দিলাম।

নাম্বার ইনভেলিড।

জানি। ছয় বছর আট মাস এগার দিন ধরে জানি।

আমি জানি, পাখিবিবি জানে।

নাম্বারটা আর ভেলিড হবে না কোনোদিন। যখন তখন আমি কল দিলে কেউ আর রিসিভ করে বলবে না ‘ওরে আমার সারি তোর জন্য সব পারি।’

দুর! এতদিন পর আমার আবার কান্না পাচ্ছে কেন? পাখিবিবি বিয়ে করতে যাচ্ছে বলে? দুর! পাখিবিবি বিয়ে করবে না। কত দেখলাম। দুর! তাও কান্না পাচ্ছে কেন? আচ্ছা, মজার কিছু মনে করে দেখি। নিক্কু খুব ডার্টি জোকস বলে। দুপুরেই লাইভে একটা বলেছে। শুনে হাসতে হাসতে মরে যাচ্ছিলাম। এখন মনে করে বিরক্ত লাগল। এত ডার্টি জোকস বলে কেন নিক্কু! আমার বাবা অনেক মজার জোকস বলত। আর আমি অনেক ছোট থাকতে অনেক গল্প বলত মজার মজার।

‘তোর জন্মের আগে তোর অনি মামার দাড়ি তিন হাত, তের আঙুল লম্বা ছিল জানিস। তার মানে বুঝতে পেরেছিস? তোর থেকেও লম্বা।’

‘ইহ্! তোমার থেকেও লম্বা?’

‘না আমার থেকে কিছু ছোট। সেই দাড়ি একদিন কী হলো শোন, চুরি হয়ে গেল।’

‘চুরি হয়ে গেল!’

‘হ্যাঁ। আর কী হবে? চোরের দল তো চুরি করতে তোর অনিমামার ঘরে ঢুকেছিল। কিছু পায় নি, কী করবে, তোর মামার দাড়িই কেটে নিয়ে গিয়ে বাজারে বিক্রি করে দিয়েছিল।’

‘ইহ্!’

‘আরে হ্যাঁ! পঞ্চাশ টাকা পঞ্চাশ পয়সা ডাক উঠেছিল নিলামে। মঙ্গোলিয়ার এক লোক সেই দাড়ি কিনে নিয়েছিল। চোরের দল পঞ্চাশ টাকা পঞ্চাশ পয়সা দিয়ে গরম রসগোল্লা আর চা খেয়েছিল বাজারের মিষ্টির দোকানে। আর খুব হাসাহাসি করেছিল।’

আরো কত রকমের গল্প। লিখলে আমার বাবা লেখক হতে পারত।

আমার এই নীল চাদরটা আমার বাবা আমাকে গিফট করেছিল, ‘এই চাদরে আমাদের দেশের সব নদীর নাম এবং মানচিত্র আছে। সারি নদী খুঁজে বের কর দেখি।’

‘উঁ-উঁ-উঁ। এই তো সারি।’

‘গুড। পর দেখি।’

এই চাদরের সব নদীর নাম আমি মুখস্থ করে বসে আছি কেন? তাক লাগিয়ে দিতাম আমার বাবাকে শুনিয়ে। কিন্তু কতবার আমি কল করি বাবাকে। নাম্বার ইনভেলিড। নীল চাদর পরে কল করি। নাম্বার ইনভেলিড। আমি কোনোদিন আমার বাবাকে আর কোনো নদীর নাম শোনাতে পারব না? রূঢ় সত্যি কথা হলো পারব না।

চলতি।

জলাহল।

বাংলা।

সন্ধ্যা।

করতোয়া।

কোনো নদী কী জানে, আমার বাবা কী করেছিল?

ছয় বছর আট মাস এগার দিন আগের সেই রাতে এসেছিল তারা।

‘আপনাকে আমাদের সাথে যেতে হবে।’

‘কী? কেন? আপনারা কারা?’

‘তোর বাপ! চল হারামজাদা!’

তারা কারা? তাদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র কিছু ছিল না। তাও আমার বাবাকে ধরে নিয়ে চলে গেল তারা।

আর কেউ কিছু জানে না।

আমার বাবা কী করেছিল?

কাকপক্ষিও কিছু জানে না। পাখিবিবি বা আমি কী জানব? আমি সারি। এখন, কখনো কখনো শুধু আমার মনে হয়, আমার নাম সারি। আমার একটা নীল চাদর আছে!