ঠাকুরগাঁওয়ে চোরাই মোটরসাইকেল ফেরত ব্যবসা জমজমাট

প্রকাশিত: এপ্রিল ৩০, ২০২০

৬০ হাজার টাকাই লাগবে। এক টাকা কম হলেও হবে না। নিলে নেন, না হলে যান। এখন নিলে ৬০ হাজার। রাত পোহালেই ৭০ হাজার লাগবে। তার কাছে আইন আদালতের কোনো বালাই নেই। যা বলবেন তাই। মোবাইল কোর্টের মতো। কোন কিছুর তোয়াক্কা করেন না তিনি। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে ৬০ হাজার টাকা দিয়েই কুখ্যাত মোটরসাইকেল চোর রাজ্জাকের কাছ থেকে ফেরত নিতে হল চুরি যাওয়া ডিসকেভার ১২৫ সিসি মোটর সাইকেলটি।

নিজের চুরি যাওয়া মোটর সাইকেল ফেরত পাওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে বর্নণা করতে গিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে স্কুল শিক্ষক হুমায়ুন কবির এসব কথা বলেন। হুমায়ুন কবির ঠাকুরগাওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার সেনুয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক। রাজ্জাকের বাড়ি পাশ্ববর্তী রানীশংকৈল উপজেলার ভান্ডরা গ্রামে ঐতিহাসিক খুনিয়া দিঘির পাশ্বে।

শিক্ষক হুমায়ুন জানান, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চলাকালিন গত শনিবার সন্ধা পৌর শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে তার ওষুধের দোকানের সামনে থেকে চুরি যায় মোটরসাইকেলটি। এরপর খোঁজাখুজি শুরু হলে একজন দালাল দর কষাকষি করে তাকে জানান, মোটর সাইকেলটি ফেরত পেতে ৬০ হাজার টাকা লাগবে। টাকা ম্যানেজ করে ঐ দালালকে সাথে নিয়ে রবিবার রাতে যান রাজ্জাকের বাড়িতে।

বাইরে অপেক্ষা করতেই চুরি যাওয়া মোটর সাইকেলটি বাড়ির ভিতর থেকে বের করে আনেন রাজ্জাক। এরপর বলেন টাকা দেন। এ সময় হুমায়ুন ৫০ হাজার টাকা দিতে চাইলে, হবে না বলে জানিয়ে দিয়ে গাড়িটি আবার বাড়ির ভিতরে নিয়ে যেতে উদ্যত হন রাজ্জাক এবং গাড়িটার দাম দেড় লাখ টাকা, ৬০ হাজারে পাচ্ছেন এমন মন্তব্য করে হুমায়ুনকে শুনিয়ে দেন উপরোক্ত কাহিনি। বাধ্য হয়েই ঐ পরিমান টাকা দিয়ে গাড়িটি ফেরত নিতে হয় হুমায়ুনকে।

হুমায়ুন আরো জানান, শুধু তিনিই নয়, গত এক সপ্তাহে পীরগঞ্জ পৌর শহরের এলএসডি গোডাউন, সাব রেজিষ্ট্রি অফিস, উপজেলার জাবরহাটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ৭/৮টি মোটরসাইকেল চুরি হয়েছে। এর মধ্যে ৩টি মোটর সাইকেলে টাকা দিয়ে ফেরত আনা হয়েছে রাজ্জাকের কাছ থেকে। বাকিগুলোরও দেন দরবার চলছে।

পুলিশকে জানান না কে? এমন প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন বলেন,টাকা দিয়ে হলেও গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু পুলিশকে বললে পাওয়াই যাবে না। কোনো ব্যবস্থাও হবে না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রানীশংকৈল উপজেলার বসতপুর গ্রামের রাজ্জাক ছোট থেকে পকেটমারি, সাইকেল চুরি সহ ছোট খাট চুরি করতে করতে ছিচকে চোর থেকে কুখ্যাত মোটর সাইকেল চোরে পরিণত হয়। পরে শহরের ভান্ডারায় আলিশান বাড়ি করে গড়ে তুলেন মোটর সাইকেল চুরির সিন্ডিকেট। শুধু জেলায় নয় দেশের বিভিন্ন এলাকার মোটর সাইকেল চোরের সাথে যোগাযোগ রয়েছে তার। মোটর সাইকেল চুরির দায়ে বহুবার পুলিশের হাতে গ্রেফতারও হন।

জেলও খেটেছেন অনেকবার। তিনি জেলে থাকা কালিনও নিয়ন্ত্রন করতেন মোটর সাইকেল চুরি সিন্ডিকেট। বর্তমানে জামিনে মুক্ত আছেন। তার শিষ্যরা এখন বেপরোয়া।

করোনাভাইরাস নিয়ে মানুষ যখন মহা দুশ্চিন্তায় ঠিস সেই মুহুর্তে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তারা। প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মোটর সাইকেল চুরি করছেন তারা। পরে দর কষাকষির মধ্য দিয়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা নিয়ে রাজ্জাক আবার তা ফিরিয়ে দিচ্ছেন মালিককে। কয়েক বছর ধরেই এ রকম কাজ কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন রাজ্জাক। আগে গোপনে এসব কর্মকাণ্ড চললেও এখন প্রায় ওপেন সিক্রেট। প্রতিদিন রাজ্জাকের বাড়িতে টাকার বিনিময়ে এমন চোরাই মোটর সাইকেলের প্রকাশ্যে লেনদেন হলেও দেখার কেউ নেই। সবাই যেন অসহায় তার কাছে।

পীরগঞ্জ থানার ওসি প্রদীপ কুমার রায় বলেন, যাদের গাড়ি হারায়, তারা পুলিশকে না বলে নিজেরাই খোঁজাখুজি করে। কি করে তারাই জানে। পুলিশকে জানায় না। তাছাড়া রাজ্জাকের বাড়ি আমার থানার সীমানায় না। আমাদের এখানে পেলেই হয়। বিষয়টি নিয়ে তিনি উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলবেন বলে জানান।

রানীশংকৈল থানার ওসি আব্দুল মান্নান বলেন, মোটরসাইকেল চুরির বিষয়ে থানায় কেউ অভিযোগ দেয়নি। দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রানীশংকৈল উপজেলা নির্বাহী অফিসার মৌসুমি আফরিদা বলেন, এ রকম কিছু হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য থানার ওসি সাহেবকে বলবেন বলেও জানান তিনি।