লকডাউনের রম্য

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৩, ২০২০

বাসু মুখোপাধ্যায়
ঘরবন্দি হয়ে থাকার জন্যই কি না কে জানে আমার লোভ সাংঘাতিক বেড়ে গেছে। ঘরে খাবার অপ্রতুল অথচ মনটা সর্বক্ষণ ‘কী খাই কী খাই’ করছে।

এই আজই যেমন। আমার চান হয়ে গেছে। বউ চান করতে গেছে। এই সময় মনটা ‘খাইখাই’ করে উঠল। অথচ আর একটু পরেই ভাত খাব। এখন কিছু খাওয়ার কোনও দরকারই নেই।

রান্নাঘরে গিয়ে জিনিসপত্র হাঁটকানো শুরু করলাম। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম। বেশ বড় এক টুকরো আমসত্ত্ব। আহা! জিভে সুড়ুৎ করে জল চলে এল। ঘরে নিয়ে এসে টিভি দেখতে দেখতে আয়েশ করে খেলাম।

বউ আরও কিছুটা পরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে বলল, ‘তোমাকে কি এক্ষুনি খেতে দিয়ে দেব? আমার একটু কাজ আছে আমি পরে খাব।’

আমি বললাম, ‘না না, কোনো তাড়া নেই। তোমার হাতের কাজ সেরে নাও। তারপর একসঙ্গে খাব। আরে এখন খিদে-টিদেকে একটুও গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়, তাই না?’

বউ বলল, ‘বলো কী? উফ্ ভাবা যায় না!’

একটু পরে রান্নাঘর থেকে বউ চেঁচাল, ‘আচ্ছা তুমি কি আমসত্ত্বটা দেখেছ? অতটা আমসত্ত্ব কী হলো?’

খেয়েছি বলে দিলেই ল্যাঠা চুকে যেত, কিন্তু হেব্বি লজ্জা করল। চুরি করে খেয়েছি বলতে পারলাম না। উল্টে রান্নাঘরে গিয়ে আকাশ থেকে পড়লাম, ‘আমি? আমসত্ত্ব? কই না তো!’

বউ বলল, ‘চানাচুরের কৌটোর পাশে রাখা ছিল, তাহলে কোথায় গেল?’

আমি বললাম, ‘তোমার বাবা কাল এসেছিলেন, তাকে একবার রান্নাঘরে ঢুকতেও দেখেছিলাম। তিনিই হয়তো লোভ সামলাতে পারেননি, খেয়ে নিয়েছেন! উফফ যা লোভ বেড়েছে ওর!’

বউ আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল, ‘আমসত্ত্বটা আজই আমি ফ্রিজ থেকে বের করে রেখেছিলাম।’

আমি মাথা চুলকে বললাম, ‘তাহলে ইঁদুরেই হয়তো খেয়ে নিয়েছে।’

বউ বলল, ‘হতে পারে। ইঁদুর যা বেড়েছে রান্নাঘরে! কবেকার আমসত্ত্ব ফ্রিজের এক কোণে পড়েছিল। ওদের মারার জন্যই ওতে বিষ দিয়ে রেখেছিলাম।’

ইঁদুরের বিষ!!!!

আমার সামনের সবকিছু ব্যাপকভাবে দুলে উঠল। পা থরথর করে কাঁপতে লাগল। ইঁদুর মারা বিষ খেয়ে মানুষ মরে যায় শুনেছি। শেষ পর্যন্ত গোলদার কেমিকেলের র‍্যাট কিলারে আমার মৃত্যু হবে!

আর অন্য সময় হলে যদি বা বাঁচার চান্স ছিল, কিন্তু এই লকডাউনের সময় তো কোনো হাসপাতালেও ভর্তি নেবে না। হয়তো বলবে ইঁদুরের বিষ খেয়েছে? তাহলে পশু-হাসপাতালে ভর্তি করে দিন।

আমি দৌড়ে বেসিনে গিয়ে গলায় আঙুল দিয়ে বমি করার চেষ্টা করলাম। কয়েকবার চেষ্টা করেও বমি হলো না একটুও।

গা মাথা কেমন ঝিমঝিম করছে! সেটা ইঁদুরের বিষের প্রভাবে নাকি ভয়ে বুঝতে পারলাম না।

বউ নির্বিকার হয়ে থালা ধুয়ে যাচ্ছে। হায়রে নারী! বুঝতেও পারছে না কী হতে চলেছে! ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললাম, ‘অনেকটা বিষ ছিল?’

বউ শীতল গলায় বলল, ‘আমসত্ত্বটা তুমি খেয়েছ, সে আমি বুঝতেই পেরেছিলাম। স্বীকার তো করলেই না, উল্টে আমার বাবার ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করলে, তাই ইচ্ছে করেই ইঁদুরের বিষের কথাটা বললাম। আমসত্ত্বটা ঠিকই ছিল। যাও আর বমি-টমি করতে হবে না, মুখ ধুয়ে নাও, ভাত বাড়ছি।’

আমি প্রচণ্ড অপমানিত বোধ করে ভাত একটু কম খেলাম। বউ অবশ্য বলল, ‘অনেকটা আমসত্ত্ব সাঁটিয়েছ! ভাত একটু কম খাওয়াই ভালো।’