বাংলা বারো মাস ও সাত দিনের নাম যেভাবে এলো

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৫, ২০২০

বছর ঘু‌রে নতুন বছর আসে। নতুন সূর্য উদয় হয় নতুন বার্তা নি‌য়ে। আসে বাংলা নববর্ষ। বাঙালির প্রাণের উৎসব, রঙের উৎসব পহেলা বৈশাখ বা বর্ষবরণ। যদিও এবারের বর্ষবরণ ঘটা ক‌রে উদযাপন হচ্ছে না। কারণ ভয়াবহ করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী মহামারি রূপ ধারণ করেছে। বিশ্ব এখন জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে করোনা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও করোনাভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।

বর্ষবরণ উৎসব বা নববর্ষ উদযাপন একটি জাতির নিজস্ব সংস্কৃতির পার্বণ। তেমনি বাংলা নববর্ষ ও বৈশাখবরণ উৎসব উদযাপন আবহমান কাল ধরে বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে।

বাংলা বর্ষবরণের উৎপত্তি সম্বন্ধে বাঙালি ও বাংলা সাহিত্যে দু-ধরনের দুটি মতবাদ চালু আছে। প্রথমত প্রাচীন বঙ্গদেশের গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক তাঁর রাজত্ব কালে আনুমানিক ৫৯০-৬২৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন। তবে ধারণা করা হয়, জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের সোমবার ১৪ এপ্রিল ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গাব্দের সূচনা হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, মধ্যযুগে কৃষি ও ভূমি অর্থাৎ হাল চাষের পর ভূমি কর আদায় করা হতো ইসলামিক হিজরী বর্ষপঞ্জি অনুসারে। বাংলার মুঘল সম্রাট আকবর ১০/১১ মার্চ ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে এই বর্ষপঞ্জিকা সংস্কার ও সংশোধনের উদ্যোগ নেন এবং সেই সময় যার নাম দেওয়া হয়েছিল ফসলী সন। তারপর সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের পর থেকে বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন গণনা শুরু হয়।

বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ একটি সৌর পঞ্জিকাভিত্তিক বর্ষ পঞ্জিকা। বাংলা ১২ মাসের নামকরণও করা হয়েছিলো নক্ষত্র মণ্ড‌লে চন্দ্রের অবস্থানের বিশেষ বিশেষ তারার অবস্থানের উপর ভিত্তি করে। এবং ১২টি মাসের নামকরণ করা হয়েছিলো জ্যোর্তিবিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ ‘সূর্য সিদ্ধান্ত’ থেকে। পরে পর্যায় ক্রমে বিশাকা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠা থেকে জৈষ্ঠ্য, উত্তারাষাঢ় থেকে আষাঢ়, শ্রবণা থেকে শ্রাবণ, পূর্বভাদ্রপদ থেকে ভাদ্র, অশ্বিনী থেকে আশ্বিন, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, মৃগশিরা থেকে অগ্রহায়ণ, পূষ্যা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, উত্তরাফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন, চিত্রা থেকে চৈত্র। তাছাড়া সপ্তাহের ৭টি দিনের নামকরণও করা হয়েছিলো সৌরমণ্ডলের সদস্যের নাম অনুসারে। শুধু ৭টি দিনের মধ্যে সোম নামটি নেওয়া হয়েছে সোম বা শিব থেকে। তাছাড়া রবি নামকরণ করা হয়েছে রবি বা সূর্য থেকে। এভাবে পর্যায়ক্রমে মঙ্গলগ্রহ থেকে মঙ্গল, বুধগ্রহ থেকে বুধ, বৃহস্পতি গ্রহ থেকে বৃহস্পতি, শুক্র গ্রহ থেকে শুক্র এবং শনি গ্রহ থেকে শনিবারের নামকরণ হ‌য়ে‌ছে।

শুরুটা যে কোন একভাবেই হয়েছিল। হয়তোবা জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ১৪ এপ্রিল থেকে অথবা বাদশা আকবরের সিংহাসনে বসার দিন থেকে সেটা বড় কথা নয়। আজকের এই বর্ষবরণ বা পয়লা বৈশাখ উদযাপন অনুষ্ঠান বাঙালি গ্রহণ করেছে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ও নিজের সংস্কৃতিকে মনে করেই। আজ পহেলা বৈশাখ, চৈতী বিদায়, বর্ষবরণ, হেমন্ত উৎসব, বর্ষার বারি, শ্রাবণও সন্ধ্যা, বসন্তের গান, শীত পার্বণ, বৈশাখ থেকে চৈত্র ১২টি মাস ও সপ্তাহের ৭টি দিনই হলো বাঙালির সৃষ্টি, কৃষ্টি ও নিজস্ব ঐতিহ্যের এক মহামূল্যবান সম্পদ।