,
সংবাদ শিরোনাম :

‘ভুলক্রমে’ তারা একদিন পৃথিবী ধ্বংস করবেন

ডেস্ক:
ভুলের সংজ্ঞাই যেন বদলে যাচ্ছে! ১৭৬ জন আরোহীসহ ইউক্রেনের একটি বিমান ভূপাতিত করার পর ইরানের সরল স্বীকারোক্তি- এটি ভুলক্রমে হয়েছে।

যেন পৃথিবীর কোনো একটি জনপদে পরমাণু বোমা ফেলার পরে কোনো একজন প্রেসিডেন্ট বললেন, ভুলক্রমে বোমাটি ফেলা হয়েছিল!

অস্ত্র, তেল আর ধর্মীয় বিভাজনের এই পৃথিবীতে এখন সবচেয়ে কম দাম মানুষের। একটি ক্ষেপণাস্ত্র মুহূর্তে ১৭৬ জন মানুষের প্রাণ কেড়ে নিল। সিরিয়া, ইরাক, পাকিস্তান, আফগানিস্তানে প্রতিদিন কত মানুষ, কত শিশু খুন হচ্ছেন, এ সবই কি তাহলে কারও না কারও ভুলের মাশুল?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বিরোধ নতুন কিছু নয়। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক মার্কিন রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শত্রু এই ইরান। কিন্তু যেহেতু ইরানও বেশ ক্ষমতাধর, ফলে যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই এখানে আক্রমণ করে দেশটি দখল করতে পারবে না। সে হিম্মত মার্কিন প্রশাসনের যে নেই, সে কথা তারা নিজেরাও জানে।

জানে বলেই তৃতীয় একটি দেশে (ইরাক) কৌশলে ডেকে নিয়ে ইরানের সবচেয়ে প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তা কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন, তার নির্দেশেই সোলেইমানিকে হত্যা করা হয়েছে। এটিও এক ধরনের সরল স্বীকারোক্তি!

ট্রাম্পের যুক্তি- মার্কিনিদের জীবন বাঁচাতেই সোলেইমানিকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ কবে সোলেইমানিকে হত্যার জন্য তাদের প্রেসিডেন্টকে বলেছিলেন, সে কথা ট্রাম্প বলেননি। বরং নিজ দেশেই তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। নিজ দেশের পার্লামেন্টেই তিনি অভিশংসনের মুখে। মানে তার নিজের গদিই যখন নড়বড়ে, তখন দেশের মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানো তথা নিজেকে দেশবাসীর নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য অধিকতর প্রয়োজনীয় প্রমাণের জন্যই যে তিনি ইরানের সবচেয়ে প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তাকে খুন করিয়েছেন, সে বিষয়ে নিশ্চয়ই কেউ দ্বিমত করবেন না।

সমস্যা হলো, ট্রাম্প এমন একজনকে খুন করেছেন, যিনি ছিলেন পুরো ইরানের সামরিক বাহিনীর হৃদপিণ্ডের মতো। যাকে বলা হতো দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির ‘ডান হাত’। খামেনির ডান হাট কেটে ফেলার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

তবে অন্য যেকোনো দেশের একজন সামরিক কর্মকর্তার নিহত হওয়ার সঙ্গে কাসেম সোলেইমানির পার্থক্যটা সুস্পষ্ট। সোলেইমানির নিহত হওয়ার পর পুরো ইরানের সাধারণ মানুষ যেভাবে রাস্তায় নেমে এসেছেন, অশ্রু ঝরিয়ে মাতম করেছেন, প্রতিশোধ নেয়ার শপথ করেছেন, রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিরা যেভাবে প্রকাশ্যে কেঁদেছেন- পৃথিবীর আর কোনো সামরিক কর্মকর্তার মৃত্যুতে সারা দেশে এমন প্রতিক্রিয়া হয়েছে কি না বা ভবিষ্যতেও হবে কি না সন্দেহ।

সোলেইমানির জন্মস্থান কেরমানে জানাজার সময় পদদলিত হয়ে অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আহত দুই শতাধিক। তার জানাজায় ১০ লাখের বেশি মানুষ অংশ নেন বলে ধারণা করা হয়।

বলা হয়, ১৯৮৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির জানাজার পর ইরানে আর কোনো জানাজায় এত মানুষের উপস্থিতি হয়নি।

যে কারণে সোলেইমানির নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে ইরান-মার্কিন যুদ্ধ লেগেই গেল বলে অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু এ কথাও ঠিক যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেমন যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানেন, তেমনি ইরানের প্রেসিডেন্ট কিংবা সর্বোচ্চ নেতা, এমনকি তাদের দেশের সাধারণ মানুষও জানেন। যুদ্ধ কেবল প্রতিপক্ষেরই ক্ষতি করে না। বরং নিজ দেশের মানুষেরও প্রাণ সংহার করে। নিজ দেশের সম্পদের ক্ষতি করে।

তাছাড়া ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই যেহেতু সামরিক শক্তিধর দেশ, ফলে যুদ্ধের চূড়ান্ত লড়াই যদি পরমাণু যুদ্ধে রূপ নেয়, তাহলে শুধু এই দুটি দেশই নয়, তার ফলে ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়বে পুরো বিশ্ব। এ কথা নিশ্চয়ই ট্রাম্প ও খামেনির অজানা নয়।

যুদ্ধের এই ভয়াবহ পরিণতির কথা ভেবেই হয়তো দু’দেশই শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে জড়াবে না। কিন্তু ইরানের বুকে ট্রাম্প যে আঘাত করেছেন, সেটিকে ইরান ক্ষমা করে দেবে সেটি ভাববারও কোনো কারণ নেই। ফলে সোলেইমানির মৃত্যুর পর থেকেই বিষয়টি আলোচনায় ছিল যে, ইরান তাহলে কীভাবে, কী কৌশলে এর প্রতিশোধ নেবে?

ধারণা করা হচ্ছিল, ইরানের প্রতিশোধটি হবে তৃতীয় কোনো জায়গায়। অর্থাৎ ইরান সরাসরি মার্কিন ভূখণ্ডে হামলা না করলেও বিভিন্ন দেশে তাদের দূতাবাসে হামলা চালাবে। তৃতীয় কোনো দেশে তাদের জনগণের ওপর আক্রমণ করবে। তাদের প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তিকে খুন করবে। আর হয়েছেও তা-ই। ৩ জানুয়ারি ইরাকের রাজধানী বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাসেম সোলেইমানিকে বহনকারী গাড়িতে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলার পর ইরাকে অবস্থিত দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরান ২২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এরপর ট্রাম্প নিজেই অবস্থা বেগতিক দেখে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার উদ্যোগ নেন। কিন্তু এর মধ্যেই ইরানের ভূখণ্ডে ভূপাতিত হয় ইউক্রেনের বিমান।

প্রথমে যান্ত্রিক ত্রুটি বলে দাবি করলেও পরে ইরান স্বীকার করে যে, এটি তারাই ভূপাতিত করেছে। আর দেশটির প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এই ঘটনায় গভীর দুঃখপ্রকাশ করে বলেছেন, এটি ‘অমার্জনীয় ভুল’ এবং ঘটনার তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।

বাস্তবতা হলো, একটি দেশের বিমান ভূপাতিত করে ১৭৬ জন মানুষকে হত্যার মতো ভয়াবহ সিদ্ধান্তটি কোনো একজন সামরিক কর্মকর্তা স্বপ্রণোদিত হয়ে করেছেন, সেখানে সর্বোচ্চ মহলের নির্দেশনা ছিল না- এমনটি ভাববার অবকাশ সীমিত।

print

(Visited 4 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ সংবাদ