,
সংবাদ শিরোনাম :

ব্যস্ততা কেড়ে নিচ্ছে সামাজিকতা

মোঃ আমিনুল ইসলাম: বর্তমান সময়ে কর্ম ব্যস্ততার দরুন মানব জীবন দিনেদিনে যান্ত্রিক হয়ে উঠছে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার অবস্থা একটু বেশিই খারাপ। মানুষ তার জীবনমান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ছুটে চলেছে সারাটা দিন, এমনকি কাজের চাপে মধ্যরাতেও বাসায় ফিরতে হয় অনেকের। কেউ ইচ্ছায়, কেউ অনিচ্ছায়, কেউ নিজের আবার কেউ পরিবারের সুখের জন্য খেটে যাচ্ছে সময় অসময়। কিন্তু যে মানুষটি দিনরাত পরিশ্রমের পর ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরছে, সে হয়তো জানতেও পারছে না তারই ঘরে তার জন্য অপেক্ষা করছে তার অতি আপনজনেরা। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে কোনোভাবে রাতের খাবার গ্রহণের পরই এই সকল পরিশ্রান্ত যন্ত্রমানবগুলি শুরু করে পরের দিনের পরিকল্পনা এবং এর সাথে সাথে লুটিয়ে পড়ে বিছানায়। সুযোগ হয়ে ওঠে না পরিবারের মধ্যে বসবাস করা মানুষগুলির সাথে সময় দেয়ার।
যেখানে পরিবারের মধ্যে বসবাস করা মানুষকেই আমরা সময় দিতে পারছি না সেখানে সমাজ সামাজিকতার প্রসঙ্গ তো অনেক দূরের কথা। দিনে দিনে সমাজটি এমন একটি জায়গায় পৌছেছে যে একই ছাদের নিচে বাস করেও পাশের ফ্ল্যাটের বন্ধু, ভাই, কিংবা আত্মীয়ের সাথে দেখা হওয়াটা যেন অনেকটা আমাবস্যার চাঁদের মত হয়ে উঠেছে। শহুরে বাস্তবতার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে আমরা ভুলে যেতে শুরু করেছি আমাদের আত্ম-পরিচয়, আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। বিচ্ছিন্ন করে চলেছি সামাজিক বন্ধন। সময়ের সাথে সাথে আমরা যোগাযোগ বন্ধ করেছি কাছে দূরের আত্মীয় পরিজনদের সাথে। জীবনের নানান আয়োজনগুলো আমরা চালিয়ে নিচ্ছি মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের সাথে।
আমি সত্যিই বড় বেশি অবাক হই যখন গ্রামীন জীবন আর শহর জীবনের পার্থক্য দেখি। আমার কাছে মনে হয় গ্রামের মানুষগুলো হয়তো একটু বেশিই সামাজিক। তারা বিপদে আপদে একসাথে মিলে লড়াই করতেই যেন বেশি ভালোবাসে। এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ এলাকার কয়েকটি ঘুরে দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল জরিপ কাজের কল্যাণে। আমি নিজ চোখে দেখেছি এলাকার মানুষগুলোকে, তাদের বন্ধনকে। আমার কাজের সুবিধার্থে একটি নামের তালিকা করার প্রয়োজন ছিল, একজনকে বলতেই সে নিজেই সকলের নাম পরিচয় লিখতে শুরু করল। একই চিত্র দেখা গেল অন্যান্য গ্রামগুলিতেও। অথচ শহরের বুকে বসবাসরত মানুষের কাছে তার সামনের বাসার মানুষটির নাম জানতে চাইলে কোনো উত্তর আসবে না। এমনকি তারা তাদের দরজার সামনে বসবাসরত মানুষটি সম্পর্কেও কোনো তথ্য জানেনা।
একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন বলতে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর জোর দিলেতো আর সামগ্রিক উন্নয়ন হবে না। সামগ্রিক উন্নয়ন হতে হলে সামাজিক, সাংস্কৃতিক উন্নয়নটাও হওয়া প্রয়োজন। সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে প্রয়োজন সামাজিক জীব হিসাবে আমাদের সামাজিক হওয়া। আর তার জন্য প্রয়োজন পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে সকলের পাশে থাকা, এক সাথে সাংস্কৃতিক আচার-অনুষ্ঠান পালন করা। নিজেদের মধ্যে আত্মিক একটা সম্পর্ক সৃষ্টি করা। নিজেকে মানবিক এবং সামাজিক করে গড়ে তুলতে সামাজিক বন্ধন সৃষ্টির কোনো বিকল্প নাই। তাই দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অংশ হিসাবে সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখতে, সামাজিক বন্ধন জোরদার করার কোনো বিকল্প নাই।

লেখক–প্রতিষ্ঠাতা, সোস্যাল চেইন ফর ডেভেলপমেন্ট।

print

(Visited 237 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বশেষ সংবাদ